মঙ্গলবার । ৯ই জুন, ২০২৬ । ২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

দলীয় প্রতীক-সম্পত্তি সব হারাচ্ছেন মমতা?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সদ্য-বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ের হাত থেকে দলের রাশ হয়তো প্রায় চলেই গেছে। এখন কি দলটির প্রতীক ও সম্পত্তিও তাদের হাত ছাড়া হবে? এমন প্রশ্ন উঠছে মানুষের মনে।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের এক মাসেরও কম সময়ে ভেঙে তিন ভাগ হয়ে গেছে তৃণমূল কংগ্রেস। একদিকে ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ইতোমধ্যে মমতার হাত ছেড়ে ৬০ জন বিদ্রোহী হয়েছেন। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদীয় দলের ৪১ জন সদস্যদের মধ্যে ২০ জন সরাসরি বিজেপিকে সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছেন সোমবার।

বিধানসভায় বিদ্রোহী দলনেতা ঋতব্রত ব্যানার্জিকে বিরোধী দলনেতা ঘোষণার পক্ষে স্বাক্ষর করেছেন ৬০ জন বিধায়ক। আবার দিল্লিতে বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভুপেন্দ্র ইয়াদভের সঙ্গে দেখা করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের একগুচ্ছ বিদ্রোহী সংসদ সদস্য।

ওই বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও উপস্থিত ছিলেন এবং তার আহ্বানেই এই বৈঠক বলে জানিয়েছেন বিদ্রোহী সংসদ সদস্য কাকলি ঘোষ দস্তিদার।

দস্তিদারের নেতৃত্বে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি দিয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন বিদ্রোহী সংসদ সদস্যরা। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের বর্তমানে ভাঙনের এই অবস্থা দেখে অনেকে মহারাষ্ট্রে ২০২৩ সালে একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বে উদ্ধব ঠাকরের হাত থেকে শিবসেনা দলের অধিকার চলে যাওয়ার তুলনা টানছেন।

তবে সত্য হলো, শিবসেনা দুইভাগ হওয়ার সঙ্গে তৃণমূলের ভাঙনের কিছু বস্তুগত পার্থক্য রয়েছে। ফলে দলের প্রতীক ও সম্পত্তি কোন ভাগের হবে, সেটা জানার আগে দেখা নেওয়া যাক, ভারতে রাজনৈতিক দলে ভাঙনের ক্ষেত্রে কী আইন আছে।

দলের প্রতীক ও সম্পত্তির অধিকার কার?
দলের প্রতীককে যে কোনও পার্টির মুখ্য পরিচিতি বলে ধরা হয়। দলের প্রতীক হাতছাড়া হওয়া সেই দলের নেতৃবৃন্দের কাছে চূড়ান্ত অসম্মানজনক বলে ধরা হয়। ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ভেঙে একনাথ শিন্ডে ও উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বে দুটি আলাদা দল গঠিত হয়েছে। একনাথ শিন্ডের দল সমর্থন দিয়েছিল বিজেপিকে এবং তারা মহারাষ্ট্র সরকারের গুরুত্বপূর্ণ শরীক দল। অন্যদিকে উদ্ধব ঠাকরে বিজেপি বিরোধী এবং বর্তমানে ইনডিয়া জোটের সদস্য।

এই রকম ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের কিছু নির্দিষ্ট আইন আছে। সিম্বলস অর্ডার ১৯৬৮- এর ১৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা আছে প্রতীকের যৌক্তিক দাবিদার বেছে নেওয়ার।

মূলত ভাঙনের ক্ষেত্রে দুই দলের সঙ্গে কথা বলে নির্বাচন কমিশন প্রতীকের মুখ্য দাবিদার বেছে নেয়। ১৯৭১ সালের সাদিক আলি বনাম ভারতের নির্বাচন কমিশন মামলার রায়ের ওপর ভিত্তি করে এক্ষেত্রে সবথেকে বেশি প্রাধান্য পায় এমপি, এমএলএ ও দলীয় সংগঠনগুলির সিংহভাগ নেতারা কোন পক্ষে আছেন সেটি বিবেচনা করে।

ভারতের সাবেক নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা জানিয়েছেন, দলের মধ্য থেকে কেউ যদি ‌‘ডিসপিউট’ দাবি করে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হন, তবেই নির্বাচন কমিশনের পক্ষে অভিযোগ খতিয়ে দেখা সম্ভব।

এই প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের কোনও ভাগই নিজেদের আসল তৃণমূল কংগ্রেস বলে দাবি করে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হননি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ ছাড়াও আরও কয়েকটি পন্থা নির্বাচন কমিশন অবলম্বন করে থাকে। ১৯৭১ সালের সাদিক আলি বনাম ভারতের নির্বাচন কমিশন মামলায় সেগুলো উল্লেখ করা হয়েছে,

প্রথমত, কোন অংশ দলের সংবিধানের প্রতি বেশি আনুগত্য প্রদর্শন করছে
দ্বিতীয়ত, দলের উদ্দেশ্য ও পন্থার সঙ্গে কোন ভাগের মতামত বেশি মিলছে

তবে উক্ত সব ক্ষেত্রেও প্রতীকের উপযুক্ত দাবিদার না পাওয়া গেলে নির্বাচন কমিশন দুই দলকে আলাদা পার্টি গঠন করতে অনুরোধ করতে পারে।

যদিও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা বলে, নির্বাচন কমিশন সরাসরি পার্টির প্রতীক নির্ধারন করতে পারে না। তবে অ্যাপেলেট অথরিটি হিসেবে কাজ করতে পারে। নির্বাচন কমিশনের বিচারে খুশি না হলে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করতে পারে দলগুলো।

সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারক ও পশ্চিমবঙ্গ মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অশোক গাঙ্গুলী বলেন, এই পদ্ধতিতে সুপ্রিম কোর্ট তখনই জড়ায়, যখন নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতির উপর প্রশ্ন তুলে কেউ সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন।

তৃণমূল কংগ্রেস এখন ভেঙে তিন টুকরো
তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহীরা যেভাবে দল ভেঙেছেন, তার সঙ্গে ভারতে ঘটে যাওয়া আগের ঘটনগুলোর কিছু অমিল রয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত ব্যানার্জি বিধায়কদের মধ্যে যে ভাঙন ধরিয়েছেন, তা আদর্শগতভাবে এখনও বিজেপি বিরোধী অবস্থানে অনড় রয়েছেন।

তিনি অবশ্য সোমবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দিল্লিতে সংসদীয় দলের যে বৈঠক হয়েছে সেই বিষয়ে তিনি অবগত থাকলেও তাদের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই।

এছাড়াও তিনি বলেন, আমরা এমন কোনও কাজ করব না যাতে অতীতে জগদীপ ধনখড়কে উপরাষ্ট্রপতি করার মতো নতুন করে বিজেপির সুবিধা হয়। যদিও সরকার কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলে তাকে ইতিবাচক বলবেন বলেই জানিয়েছেন ঋতব্রত।

অন্যদিকে, দিল্লিতে বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভুপেন্দ্র ইয়াদভ ও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে যে তৃণমূল কংগ্রেসের একগুচ্ছ বিদ্রোহী সংসদ সদস্য দেখা করেছিলেন, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন এমপি শর্মিলা সরকার।

ওই বৈঠকের পরে জানানো হয়েছে, কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে এই নতুন ব্লক সংসদে শাসকগোষ্ঠী বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএকে সমর্থন দেবে। রাজ্যে ঋতব্রতের নেতৃত্বে যে আলাদা তৃণমূল ব্লক তৈরি হয়েছে, সংসদীয় বিদ্রোহী ব্লকটি এই রাজ্য ব্লকের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, সেই উত্তর দিতে চাননি শর্মিলা সরকার।

তবে তর্কের খাতিরে যদি ঋতব্রত ও কাকলি ঘোষ দস্তিদারের ব্লককে আলাদা ব্লক ধরা হয়, তাহলে দেখা যায় যে তৃণমূল মোট তিনভাগে ভাগ হয়ে গেছে। এইরকম কোনও দৃষ্টান্ত ভারতের ইতিহাসে দেখা যায়নি।

এছাড়া আগেই বলা হয়েছে, এখনও কোনও বিদ্রোহীদের ভাগই নিজেদের প্রকৃত তৃণমূল বলে দাবি করে ডিসপিউটের অভিযোগ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়নি। ফলে দলের প্রতীক ও সম্পত্তির আসল দাবিদার কারা সেই নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

২০২৪-২০২৫ সালের সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, তৃণমূল কংগ্রেসের মোট সম্পত্তির পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। যার মধ্যে স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ সাত কোটি, বিনিয়োগ ২৫০.৮ কোটি ও ব্যাংকে রাখা নগদ ৬৮১.১ কোটি টাকা। আয়ের নিরিখে বিজেপির পরেই ভারতের সবথেকে বেশি সম্পদশালী দল তৃণমূল কংগ্রেস।

ফলে দলের ভাঙনে যদি কোনও ভাগ নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয় এবং মমতা বিরোধী কোনও ব্লক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তাতে যে শুধু প্রতীকই হাতছাড়া হতে পারে তা নয়। আইনত, প্রতীকের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের এই বিপুল পরিমাণ সম্পদও চলে যাবে মমতার হাত থেকে।

আগে কোন কোন দলে ভাঙন হয়েছে?
সাম্প্রতিক অতীতে ভারতের রাজনীতিতে সবথেকে বড় ভাঙন হলো মহারাষ্ট্রের শিবসেনা দলের ভাঙন। এই ভাঙনে পার্টির রাশ চলে যায় স্বয়ং প্রতিষ্ঠাতা বাল ঠাকরের পুত্র উদ্ধব ঠাকরের হাত থেকে। পার্টি প্রতীকের দখল নেন একনাথ শিন্ডে এবং তিনি বিজেপিকে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রীও হন মহারাষ্ট্রের।

একই রাজ্যে শরদ পাওয়ারের দল এনসিপি ভেঙে দলীয় প্রতীক নিজের কুক্ষিগত করেন তার ভাতিজা অজিত পাওয়ার। তিনিও মহারাষ্ট্রের শাসকদলের শরীক হন এবং রাজ্যটির উপমুখ্যমন্ত্রী হন।

গত ২৮ জানুয়ারি বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি মহারাষ্ট্রের উপ-মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ৯০-এর দশকে সরকার গড়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করত জনতা দল। তবে পরে দলটি আঞ্চলিক দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায়; বিহারে জনতা দল ইউনাইটেড ও কর্নাটকে জনতা দল সেকুলার।

১৯৮৭ সালে তামিলনাডুতে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় নির্বাচন কমিশন।

এম জি রামাচন্দ্রনের মৃত্যুর পরে এআইডিএমকে দলে ভাঙন ধরান জে জয়ললিতা। তখন সংসদ সদস্য ও বিধায়করা মূলত এম জি রামাচন্দ্রনের স্ত্রী জানকীকে সমর্থন দিলেও দলের সাংগঠনিক কর্মীরা জয়ললিতাকে সমর্থন দিয়েছিলেন।

অবশ্য পরে জয়ললিতা ফের সমর্থন প্রদর্শন করেন, তাই এই ঘটনার মীমাংসা করার দরকার পড়েনি নির্বাচন কমিশনের।

ভারতের জাতীয় ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৬৯ সালে ইন্দিরা গান্ধীকে কংগ্রেসের সিনিয়র নেতারা বহিষ্কার করলে তিনি নব্য কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করে নির্বাচনে লড়াই করেন ও ১৯৭১ সালে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন। তিনিই কংগ্রেসের উত্তরাধিকার খেতাব পান।

তখন কংগ্রেসের প্রতীক ছিল একটি গাই ও একটি বলদ। ইন্দিরা গান্ধী প্রথমে ওই প্রতীকেই ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত লড়াই করেন। পরে কংগ্রেসের নব্য অংশটিকে তিনি আলাদা করে দেন ও হাত চিহ্ন গ্রহণ করেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি দুইভাগে ভাগ হয়ে যায় ১৯৬৪ সালে। মতাদর্শের পার্থক্যের কারণে দুটি দল আলাদা হয়ে গেলেও পরে বাম জোটের অংশ হয়েই থেকেছে দুটি দল।

বিবিসি বাংলা

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন